Showing posts with label বাংলা ব্লগ. Show all posts
Showing posts with label বাংলা ব্লগ. Show all posts

Sunday, November 23, 2008

মণিপুরী থিয়েটার পেয়েছে বাংলাদেশের সেরা নাট্যদলের সম্মাননা


সারা দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নাট্যদল হিসাবে "আরজু স্মৃতি নাট্যপদক" লাভ করেছে মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে উঠা মণিপুরী থিয়েটার। মণিপুরী থিয়েটার বাংলাদেশের অন্যতম প্রান্তিক জাতিসত্তা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের সাংস্কৃতিক ধারার একটি সংগঠন। প্রায় একযুগ ধরে মণিপুরীদের ঐতিহ্যগত মিথগুলো নাট্যমঞ্চে উপস্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ করে আসছে এই প্রতিষ্ঠানটি। "সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের নান্দনিক হাতিয়ারই থিয়েটার" - এই বিশ্বাসকে ধারন করে ১২ বছর ধরে ব্যাপৃত রয়েছে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষায়।

গত ২৮ জুন, ২০০৮ সন্ধ্যায় বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মিলনায়তনে এ পদক দেওয়া হয়। উল্লেখ্য বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাবেক অনুষ্ঠান সম্পাদক প্রয়াত আরজুর নামে এই স্মৃতিপদক প্রবর্তন করা হয়। এবছর দেশব্যাপী প্রায় দুইশ নাট্যদল থেকে চুড়ান্তভাবে পাঁচটি মনোনয়নের পর সেরা দলটি নির্বাচন করা হয়। এই প্রথমবার কোন নাট্যকার বা নাট্যনির্দেশককে না দিয়ে নাটকের দলকে পদক দেয়া হলো।


বিস্তারিত দেখুন:
১. সেরা নাট্যদল মণিপুরী থিয়েটার- প্রথম আলো
২. Arju Padak'08 went to Monipuri Theatre- The Daily Star


নাট্যপ্রতিকুল পরিবেশেও মণিপুরী থিয়েটার চালিয়ে যাচ্ছে স্বতন্ত্র ও ভঙ্গিতে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই। মণিপুরী থিয়েটারে কাজ করছেন শুভাশিস সিনহা সমীর, জ্যোতি সিনহা, অপর্ণা সিনহা এবং শর্মিলা সিনহার মতো গুণান্বিত একদল নাট্যকর্মী। সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, গবেষনা, পাঠচর্চ্চার পাশাপাশি প্রতিবছর মনিপুরীদের কৃত্যমুলক উৎসবগুলো বর্ণাঢ্য আংগিকে আয়োজন করে থাকে মণিপুরী থিয়েটার। তাদের রয়েছে বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় ৩২টি প্রযোজনা।



মণিপুরী থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাঃ

বাংলা ভাষার নাটক

* মেঘ বৃষ্টি রোদ
* আজবপুরের বর্ষবরন
* নাই রাজার রাজদরবার
* কানাইলালের সানাই
* যাত্রা
* সুর বেসুর
* করকুন্তী সংবাদ
* দুর্ভাগা
* সাঁকো


বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার নাটক
* নারগো ডাঙর ইলি
* তারালেইমার পালা
* মেঙসেল
* জুতা আবিস্কার
* শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন
* সালয়া যানা
* চন্দ্রকলা
* ধ্বজো মেস্তরীর মরন
* নুংশিপী
* রুদ্রচন্ড
* ভানুবিল
* আমি আহিলেই
* ডিম্বরাজা
* মেঙসেল নেই গাঙর য়ারি
* সওদাগরর পাচগো পিতক
* ইঙাল আধাঁর পালা

সম্পাদিত প্রযোজনা
* মণিপুরী হোলি
* মণিপুরী রাসলীলা
* মণিপুরী বেলীরাস

Tuesday, November 11, 2008

এগিয়ে চলেছে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার উইকিপিডিয়া


মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াতে বিশ্বের ২৬৪টি ভাষার মধ্যে বাংলাদেশের একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। ভাষাটির নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী । বাংলাদেশের সিলেট, মৌলবীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের প্রায় ৬০,০০০ আদিবাসি এ ভাষায় কথা বলে থাকে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের উত্তরপুর্বাঞ্চলের আসাম, ত্রিপুরা ও মণিপুরে এবং বার্মায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জাতির লোক বাস করে।

বর্তমানে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী উইকির (Bishnupriya Manipuri Wikipedia) নিবন্ধ সংখ্যা ২৩,৩৯৩ টি, প্রতি নিবন্ধে গড়ে ৪৭৪০টি অক্ষর এবং নিবন্ধসংখ্যার বিচারে এর অবস্থান বিশ্বের ২৬৪টি দেশের মধ্যে ৫০তম । অন্যদিকে বাংলা উইকির নিবন্ধ সংখ্যা ১৮,০৬২টি, প্রতি নিবন্ধে গড়ে ৩৯৫৭টি অক্ষর এবং এর অবস্থান ৬২তম।

রাষ্ট্রশক্তির অবহেলা, প্রবঞ্চনা ও দমননীতির কারণে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রভাবে ক্রমশ তাদের ভাষা এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে চলেছে। ভারত ও বাংলাদেশে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সুদীর্ঘ সংগ্রাম , রক্তপাত এবং জীবন আত্মত্যাগের বিনিময়ে ভারত সরকার ভাষাটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার কোন সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই, পাঠ্যপুস্তক এবং বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ বলে প্রচারিত বাংলাপিডিয়ায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের কোন উল্লেখই নেই। সেকারণে মাতৃভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বিলুপ্তি থেকে মাতৃভাষাকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী উইকিপিডিয়া'র যাত্রা এবং তারপর আজকের অবস্থানে পৌঁছানো বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের জন্য একটি বিরাট অর্জন।

আমাদের লোকবল খুবই কম কারণ বাংলাদেশ বা ভারতের যে সব অঞ্চলে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা বসবাস করেন সেসব এলাকায় টেলিযোগাযোগ বা ইন্টারনেট প্রযুক্তি এখনো পৌঁছায়নি। সংখ্যায় বেশী হওয়া সত্ত্বেও ভারতের ব্যবহারীরা ইউনিকোডতো দুরের কথা, বিজয় বা মুনীর কীবোর্ডের সাথে পরিচিত নয়। সেখানে ডিটিপির জন্য আসামীজ কীবোর্ড ব্যবহৃত হয় যা আমাদেরগুলি থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। অল্প সংখ্যক ব্যবহারকারির উৎসাহ ও পরিশ্রমের ফলে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী উইকি আজ এ পর্যায়ে আসতে পেরেছে। বিশেষ করে উদ্যোক্তা উত্তম সিংহ এর পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তিনি ডাটাবেজ ও বটস্ক্রীপ্টের সফল ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের উপর একাই কয়েক হাজার ভূক্তি যোগ করেছেন। বর্তমানে এ প্রজেক্টের জন্য কোয়ালিটি গবেষক, অনুবাদক ও ভলান্টিয়ার যোগাড় করা হচ্ছে যারা BPY উইকির নিজস্ব নিবন্ধ (যেমন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি বিষয়ক) লেখার পাশাপাশি রোবট স্ক্রিপ্ট দিয়ে করা প্রাথমিক মডেল বা খসড়াগুলোতে কাজ করতে পারেন।


বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী উইকিপিডিয়ার লিংক: http://bpy.wikipedia.org
উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ সংখ্যার হিসাব: http://meta.wikimedia.org/wiki/List_of_Wikipedias

Sunday, November 09, 2008

তিনটি সমকালীন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতার বাংলা অনুবাদ


ধনঞ্জয় রাজকুমার
প থ
পথকে মালা পরিয়ে দাও
ওই পথের গর্ভ থেকেই আমাদের জন্ম হয়েছিল ।


রঞ্জিত সিংহ
আ জ ও সে আ সে
আর
বিধবা নদীটি এসেছিল
আমাদের উঠান পর্যন্ত।
মন্দ্রিত রৌদ্রের মতো কী শান্তি
স্বপ্ন দেখেছিল সে।
বিশ্রামহীন তিনরাস্তার কোন পুলিশপয়েন্টের মতো
উদভ্রান্ত এখন।
তৃষ্ণাথরথর বুক চাপরিয়ে কেঁদে কেঁদে
আমার কাছে চেয়েছিল দু'ফোটা জল
আমি নিরুপায় ভয়ে লজ্জায়
ঘরের ভেতর নিঃশব্দ বসেছিলাম
এখনও আমি ভিজে উঠি চোখে -
নিষ্তেজ আমি
এমন নিম্নজ!

আর
বিধবা নদীটি এসেছিল
আমাদের উঠান পর্যন্ত।



সন্তোষ সান্তান
স ম্প র্ক সি রি জ - ২
ইস্কপনের বিবির সাবঅল্টার্ন য়াবেরুনীর সৌন্দর্যে নিপুন এক কবিতা লিখে যাব, এমন সময় হাতের তালু দাবী করে রাজসুলভ ভাগ্যলিপি। যে শিণ্পের টানে একজন জন্মকবি দারিদ্রের সাথে সংসার পাতে, সেই নির্বাক শিল্প ছড়িয়ে থাকে অতিচেতনায়, যুক্তির বাইরের কোন পৃথিবীতে। ইশ্বরের লীলা যেন মাকড়শার জাল। ইশ্বরও এখন বৃদ্ধ। তাকেও স্ট্রাগল করে বাঁচতে হয়। আকাঙ্খায় পূর্ণ আজ পিতলের বাটিখানা। প্রতি পদক্ষেপে বিধিনিষেধ, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ট্যাবু
সান্ধ্য আরতির মৃদঙ্গের তালে তালে নাচে নারীদের কন্ঠ। জয়দেবের গীত শুরু হলে আসরের বৈষ্ণব-নামাবলী থেকে নেমে আসের অষ্টসখির প্রানধন কৃষ্ণ। কৃষ্ণ, ময়ুরকন্ঠী রঙের নামবাচক এ বিশেষ্যের দ্বিতীয় অক্ষরটি যুক্তবর্ণ; "ষ" ও "ণ", এ দুই ব্যঞ্জনের মাঝে ছোট্ট একটি ফাঁকও খুঁজে পেলাম না, যেখানে অনায়াসে ঢুকিয়ে দেতে পারব বর্ণিল কিছু মানবতা। এদিকে "ক" খুব একলা, তার সাথে মিশে আছে "ঋ" কার, একা থাকলে তার গায়ে মেখে দিতাম কনেরাঙা মমতা; আর
কলঙ্কিনী রাইয়ের জন্য খয়েরি রঙের কিছু স্মৃতি। কলঙ্কিনী রাই আসলে এমন একটি নাম যার কোনো সর্বনাম নেই, আছে শুধু আকিঁবুকিহীন দুঃখীনি বিশেষন।আমরা জানি, বিশেষ্যের সাথে বিশেষনের ব্যবহার আত্মিক তৃপ্তি এনে দেয়।

ঘোমটার মতো শাদা কুয়াশা পৃথিবী মায়ের কোলে ছড়িয়ে পড়লে অবুঝ এ মন বৈষ্ণব-খড়ম, অহংকারী সানগ্লাস, অপরূপ কবিতা সব রেখে বৃন্দাবনের দিকে সরে পা বাড়ায়।

*য়াবেরুনী - কাঁচুলি বিশেষ। আগে মনিপুরী মেয়েরা শরীরের উর্ধ্বাংশে ব্যবহার করতো।
*জয়দেব - আষাঢ় মাসে মনিপুরীদের কাঙ উৎসবের সময় কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ গাওয়া হয়


ধনঞ্জয় রাজকুমার : আধুনিক বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতার জনক। জাতি, সংস্কৃতি, অতীত, ও শেকড়কে নিজের বিশাল কাব্যক্ষমতায় ধারন করেছেন। আশির দশক এবং তৎপরবর্তী কবিদের অধিকাংশ অনুসরন করেছেন তার পদাংক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : হপনর বাবুয়ানি, ডিগল হাতহানল মোরে, ভিক্ষা দেনে এর আহিগিতৌ, হমাজি গাটর পানি ইত্যাদি।
রঞ্জিত সিংহ : নব্বই দশকের কবি। অরন্য রুপকল্প ও শান্ত সমাহিত বয়ানধরনের পাশাপাশি রাজনীতিশ্পর্শী এক গভীর হাহাকার তার কবিতায় ছুঁয়ে যায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : মোর ইমারঠার মোর প্রেমর কবিতা।
সন্তোষ সান্তান : নতুন শতাব্দীর কবি। প্রতিস্ঠান বিরোধিতার তার্কিক জায়গা থেকে হিউমারের মধ্য দিয়ে পেশ করেন কবিতা। বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ভাষার মাসিক সাহিত্যপত্র "নুয়া এলা"য় নিয়মিত লেখেন।
সূত্র: মনিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ। ভুমিকা ও অনুবাদ- শুভাশিস সিনহা। ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০৭।
ছবি: শক্তিকুমার সিংহের পেইন্টিং

মণিপুরীদের পুঁথিপাঠ বিষয়ে Daily Star এর বিভ্রান্তি


ঢাকা থেকে প্রকাশিত The Daily Star পত্রিকার ৪ জুন ২০০৮ সংখ্যায় মণিপুরীদের পুঁথিপাঠ বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে। Daily Star লিখেছে - "In tea gardens, the Monipuri labourers listen to puthi with musical instruments like dhol, mridanga, korotaal and harmonium." সাইমন জাকারিয়াকে উদ্ধৃত করে লেখা রিপোর্টে ডেইলি স্টার চা-শ্রমিক এবং মণিপুরী দুটি আলাদা জাতিসত্তাকে গুলিয়ে ফেলেছে। মণিপুরীরা চা বাগানে থাকে না, চা বাগানের শ্রমিকরা ভিন্ন জাতি, তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। কথা হলো পুঁথিপাঠের মতো গুরুগম্ভীর বিষয় কিভাবে ঢোল, মৃদংগ, করতাল বা হারমোনিয়ামের সাথে পরিবেশিত হয় বোধগম্য নয়। আর দেশের প্রথম সারির একটি জাতীয় ইংরেজী দৈনিকে বহুল প্রচলিত "Manipuri" শব্দটিকে এভাবে ভুল বানানে "Monipuri" লেখার হেতু কি?

মণিপুরীদের পুঁথিপাঠের ঐতিহ্য সহস্রাধিক বছরের। কার্তিক মাসে মহারাস উৎসবের আগে মাসব্যাপী পুঁথিপাঠ ও শ্রবন মণিপুরী লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ। পর্বটি "নিয়মপালি" বা "নিয়মসেবা" নামে পরিচিত। নিয়মপালিতে ভক্ত শ্রোতাদের সম্মুখে মহাভারত, রামায়ন, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ইত্যাদি পৌরাণিক ও ধর্মীয় গ্রন্থের পাঠ ও ব্যাখ্যা করা হয়। একজন বা দু'জন বিদ্বান ও পন্ডিতশ্রেণীর ব্যক্তি এই দ্বায়িত্ব পান। যিনি পাঠ করেন তাকে বলা হয় "থিপা" আর যিনি ব্যাখ্যাদান করেন তাকে বলা হয় "য়ারিলিপা"। পুঁথিপাঠ শেষ হলে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র সহযোগে বৈষ্ণব পদাবলী গাওয়া হয়। এরপর ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরন করা হয়। নিয়মপালি মুলত মণিপুরীদের লোকশিক্ষার একটি অংশ। এখানে ধর্মীয় গ্রন্থের অমৃতবাণীর আড়ালে সততা, মুল্যবোধ ও নৈতিকতার সামাজিক শিক্ষা দেয়া হয়।



* ব্লগে মণিপুরীদের কার্তিকা ও নিয়মপালি সংক্রান্ত আরেকটি লেখা
* ইউ টিউবে দেখুন মণিপুরী পুঁথিপাঠের ভিডিও

মণিপুরী নৃত্যকলার প্রসারে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনবদ্য ভুমিকা, রবীন্দ্রনাথের গানে মণিপুরী সুর এবং অন্যান্য প্রসংগ


মণিপুরী সংস্কৃতির সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা মণিপুরী নৃত্য। মণিপুরী নৃত্যকলা তার কোমলতা, আঙ্গিক, রুচিশীল ভঙ্গিমা ও সৌন্দর্য দিয়ে জয় করেছে ভারতর্ষের অসংখ্য দর্শকের মন। শুধুমাত্র মণিপুরী জীবনধারা ও ধর্মাচরনের সাথে জড়িত এই নৃত্যকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কবিগুরুর ভ্রমনের ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৯১৯ সালে তিনি সিলেট ভ্রমনে এলে ৬ই নভেম্বর সিলেট শহরের অদুরে মাছিমপুর পল্লীতে বেড়াতে আসেন। সেখানকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মেয়েরা কবিগুরুকে অভ্যর্থনা জানান এবং পরে তার সম্মানে কবির বাংলোতে মণিপুরী নৃত্যের আসর আয়োজন করা হয়। দুপুরে কবিগুরুকে ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী গোষ্ঠলীলা এবং রাতে মণিপুরী রাসলীলা দেখানো হয়। কবিগুরু মণিপুরী নৃত্যের সজ্জা, সাবলীল ছন্দ ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হন এবং শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েদের এ নৃত্য শেখাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী নৃত্যশিল্পী ইমাগো দেবী। ইমাগো দেবীকে কবিগুরু শান্তিনিকেতনে নিয়ে যেতে চাইলেও মণিপুরীদের কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের জন্য তা সম্ভব হয়নি।

কবিগুরুর আমন্ত্রনে প্রথমে মণিপুর থেকে তিনজন নৃত্যশিক্ষক শান্তিনিকেতনে আসেন , কিন্ত বাংলা জানা না থাকার কারণে তার ফিরে যান। এরপর ১৯২৬ সালে আগরতলা থেকে গুরু বুদ্ধিমন্ত সিংহ এবং ত্রিপুরা থেকে গুরু নবকুমার সিংহ শান্তিনিকেতনে যোগ দেন। প্রথমবারের মতো মনিপুরী নৃত্য ব্যবহার করে শান্তিনিকেতনে মঞ্চষ্থ হয় "নটীর পুজা" ও "ঋতুরঙ্গ"। ২য় পর্য়ায়ে কবিগুরুর আমন্ত্রনে যোগ দেন সিলেটের কমলগঞ্জের বালিগাঁও গ্রামের বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী নৃত্যগুরু নীলেশ্বর মুখার্জ্জী। এরপর শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্যের জন্য আলাদা শাখা গঠন করা হয়।

রবীন্দ্রসংগীতের গভীরতা ও কাব্যময়তার সাথে মণিপুরী নৃত্যের সাবলীল গতি ও বিশুদ্ধ নান্দনিকতার মধ্যে বিশেষ সামঞ্জস্য থাকায় শান্তিনিকেতনে উচ্চাঙ্গ নৃত্যধারার মধ্যে মণিপুরী নৃত্য সর্বাপেক্ষা সমাদৃত হয়। এরপর বাংলাদেশে এবং সারা ভারতে মণিপুরী নৃত্যের প্রচার ও প্রসার ঘটে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ মণিপুরী গানের সুর ও তাল দিয়েও প্রভাবিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের "শ্যামা" ও "চন্ডালিকা" ও নৃত্যনাট্যে আংশিক এবং "চিত্রাংগদা " নৃত্যনাট্যে সম্পুর্নভাবে মণিপুরী নৃত্যের সুর ও তাল অনুসরন করা হয়েছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক গানে মণিপুরী সুর ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন -


  • শ্রীবাস কাছে থেকে দুরে কেন ছিলগো আধাঁরে

  • আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

  • রোদন ভরা এ বসন্ত

  • বাকি আমি রাখবো না

লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা মণিপুরী নৃত্যের বিশ্বময় প্রচার এবং মনিপুরী সংস্কৃতির পুনর্জাগরনে অসামান্য ভুমিকা রাখার জন্য মনিপুরীরা আজো কবিগুরুকে মণিপুরী নৃত্যের পথিকৃৎ হিসাবে বিবেচনা করেন। মণিপুরী নৃত্যগুরুরা আজো গভীর শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারন করেন কবিগুরুর নাম। সম্মানিত করার জন্য কবিগুরুর লেখা গান মণিপুরী রাসলীলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । সিলেটের মাছিমপুরের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী পল্লীতে স্থাপন করা হয়েছে কবিগুরুর প্রতিকৃতি।



তথ্যসুত্রঃ
১. আকাংখা - শান্তিনিকেতনের পত্রিকা ১৩২৬ বাংলা
২. শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ - অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাস
৩. ভারতের নৃত্যকলা - গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায়
৪. Tagore and his influence in Bishnupriya Manipuri Society

Friday, November 07, 2008

বাংলাদেশের সরকারি পাঠ্যবইতে মণিপুরীদের সম্বন্ধে ভুল তথ্য



পাঠ্যবইতে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যাবলীর সমাবেশ ঘটানো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য প্রধান দিক। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক র্বোড বলে আমাদের একটি সংস্থা আছে যেটি নানান সরকারের আমলে নানানরূপে এই আকামটি করে থাকে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত পঞ্চম শ্রেণীর ‘পরিবেশ পরিচিতি সমাজ’ এবং নবম ও দশম শ্রেণীর ‘English for Today’ পাঠ্যবইতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সীমানায় বসবাসরত মণিপুরী জনগোষ্ঠি সমন্ধে একগাদা ভুল ও বিকৃত তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব পাঠ্যগুলোতে আদিবাসী মণিপুরী জনগোষ্ঠির প্রধান ও বৃহত্তম শাখা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের সম্পুর্নরূপে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। উপরন্তু মণিপুরীদের জীবনধারা, ভাষা ও সংস্কৃতি সমন্ধে যেভাবে ভিত্তিহীন, খন্ডিত এবং ত্রেবিশেষে মনগড়া ও হাস্যকর তথ্যের অবতারনা করা হয়েছে, রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক এবং একজন মণিপুরী হিসাবে তা আমার অনুভূতিকে গভীরভাবে আহত করেছে।

মণিপুরীরা বাংলাদেশের একটি অনগ্রসর ও অবহেলিত ক্ষুদ্র জাতিসত্তা। সিলেট বিভাগের এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠি সমৃদ্ধ ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারি হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘুতা ও অনগ্রসরতার কারণে বিগত সরকারগুলোর আমলে উপোক্ষ ও অবহেলার শিকার হয়েছে। উল্লেখ্য, বিগত ২০০০ সনে পাঠ্যপুস্তকে মণিপুরীদের সমন্ধে ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য আমার একটি আবেদন দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক প্রথম আলো এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তী কালে মণিপুরীদের প্রতিনিধিত্তকারী বিভিন্ন সংগঠন তৎকালীন আওয়ামী লীগ এবং বিগত বিএনপি সরকারের আমলে বিভিন্ন সময়ে স্মারকলিপি প্রদান করে প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু আজ অবধি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বা শিক্ষা মন্ত্রনালয় এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি। আদিবাসি জনগোষ্ঠি হিসাবে সরকার প্রদত্ত শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধাদি একচ্ছত্রভাবে ভোগ করার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালিত একটি বিশেষ মহলের অপতৎপরতা এর মুল কারণ বলে মণিপুরীরা মনে করছে। পাঠ্যপুস্তকসহ অন্যান্য সরকারি প্রকাশনা এবং প্রচারমাধ্যমে মণিপুরীদের সম্বন্ধে উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে ভুল এবং পপাতদুস্ট তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করার উদ্দেশ্য জনমানসে মণিপুরী পরিচিতি নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিভাজন সৃস্টির এই অশুভ তৎপরতা বন্ধ হওয়া জরুরী এটাই কাম্য।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ঢাকা থেকে প্রকাশিত পঞ্চম শ্রেণীর ‘পরিবেশ পরিচিত সমাজ’ পাঠ্যবইটির রচনায় ড. সাবিহা সুলতানা, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, সেলিনা আক্তার ও লুৎফুর রহমান এবং সম্পাদনায় প্রফেসর মোহাম্মদ আলতাফ হোসেনের নাম রয়েছে। অন্যদিকে নবম ও দশম শ্রেণীর ‘English for Today’ বইটির রচয়িতা হিসাবে নায়না শাহজাদী, ফজলে রাব্বানী ও শামীমা তাসমিন এবং সম্পাদক হিসাবে এম. এস. হক এর নাম রয়েছে। কোন জাতিসত্তা, তাদের জীবনধারা, ভাষা বা সংস্কৃতির মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে চর্চা করার পুর্বে পর্যাপ্ত গবেষনা ও মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু অত্যন্ত দু:খের বিয়য় যে উপরোক্ত দুইটি পাঠ্যবই রচনার ক্ষেত্রে মাঠপর্য়ায়ে কোন তথ্য সংগ্রহ বা গবেষনার ধারা অনুসরন করা হয়নি। পঞ্চম শ্রেণীর ‘পরিবেশ পরিচিত সমাজ’ পাঠ্যবইটির ‘বিশ্বের বিভিন্ন জাতি’ শীর্ষক ষোলতম অধ্যায়ের ১৪৩, ১৪৪ ও ১৪৫ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘মণিপুরী’ শিরোনামের লেখাটিতে বাস্তবের সাথে সংগতিহীন তথ্যের অবতারনা করা হয়েছে। যেমন -

(১) ‘এদের আদি বাসস্থান আসামের মণিপুর রাজ্যে।’
প্রকৃতপে মণিপুর ভারতের উত্তর-পুর্বাঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র রাজ্য (২৩.৫
º-১৫.৩º উত্তর আংশ থেকে ৯৩.১º -৯৪.৩º পুর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং আয়তন ২২, ৩২৭ বর্গ কি.মি.); এর রাজধানীর নাম ইম্ফাল। মণিপুর আসামের অন্তর্গত নয়; আসাম হলো মণিপুরের সীমান্তবর্তী আরেকটি ভিন্ন রাজ্য এবং এর রাজধানী দিসপুর।

(২) ‘
তাদের গায়ের রং ফর্সা, চোখ ছোট, নাক কিছুটা চ্যাপ্টা, উচ্চতা মাঝারি।’
প্রকৃতপে মণিপুরীদের সবার গায়ের রং ফর্সা নয়,সবার চোখ ছোট বা সবার নাক চ্যাপ্টাও নয়। মণিপুরীদের মুখাবয়বে একইসাথে অনার্য্য ও আর্য্য বৈশিষ্ঠ্য ল্য করা যায়। মণিপুরীদের মধ্যে তিনটি শাখা রয়েছে - (১) বিষ্ণুপ্রিয়া, (২) মৈতৈ ও (৩) পাঙন। বিষ্ণুপ্রিয়ারা ককেশয়েড মহাজাতির আর্য-ভারতীয় সাব-ফেমিলির অšতর্গত এবং তাদের দৈহিক গড়ন মিশ্র আর্য ও ভোটব্রহ্মী । মৈতৈরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির টিবেটো-বার্মান সাব-ফেমিলির অšতর্গত এবং তাদের দৈহিক গড়ন মিশ্র মঙ্গোলীয়। পাঙনরা পাঠান বংশদ্ভুত।

(৩) ‘
বিয়েতে ছেলেমেয়েরা একত্রে দেবতাকে খুশী করার জন্য নৃত্য পরিবেশন করে।’
মণিপুরীদের বিবাহ অনুষ্ঠানটি অনুসরন করা হয় প্রাচীন মণিপুরী রীতির সাথে বৈদিক প্রাজপাত্য বিবাহরীতির সমন্বয় ঘটিয়ে। পরিচিতি, লগ্ন নির্ধারন ও আপ্যায়নের জন্য বিবাহের পুর্বে ‘ওয়ারৌপৎ’ ও ‘হেইজাপৎ’ নামে দুটি অনুষ্ঠান থাকে। বিবাহের দিন বৈষ্ণব রীতি অনুসারে পুরুষ পালাকার ও মৃদঙ্গ বাদকদের পরিবেশনায় বৈষ্ণব পালাকীর্ত্তন পরিবেশিত হয়, এর বাইরে কোন প্রকারের নাচের অনুষ্ঠানের অবকাশ নেই। পরে পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ এবং বরকে ঘিরে কনের সপ্ত-প্রদক্ষিনের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হয়।

(৪) ‘
পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য তারা নদীর ধারে বাড়ি নির্মান করে।’
মণিপুরীরা পাহাড়ের অধিবাসী বা অরণ্যচারী নয়, তারা সমতলের বাসিন্দা। পুর্বপুরুষদের বিধান অনুসারে তারা বাড়ীর চারদিকে পর্যাপ্ত জায়গা রেখে বসতবাড়ি নির্মাণ করে থাকে এবং এই বসতবাড়ী নির্মাণের সাথে নদীর অবস্থানের কোন সম্পর্ক নেই। তাছাড়া নদীর দুষিত পানি কোন আনুষ্ঠানিক বা গৃহস্থালী কাজে মণিপুরীরা ব্যবহার করেনা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের পাশ দিয়েই কোন না কোন নদী বয়ে চলেছে, এক্ষেত্রে আলাদাভাবে মনিপুরীদের বসতবাড়ীর সাথে নদীর অবস্থান খুঁজে বেড়ানো বাহুল্যমাত্র।

(৫) ‘
মণিপুরীদের নিজস্ব কোন ধর্ম নেই।’
মণিপুরীদের নিজস্ব লৌকিক ধর্মের নাম ‘আপোকপা’ যা অত্যন্ত প্রাচীন, আধ্যাত্তিকতায় গভীর ও দার্শনিকভাবে উচ্চস্তরের। প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা নিজের প্রতিকৃতি থেকে মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি মানুষ সৃস্টিকর্তার একেকটি ছায়া। এখনো মণিপুরী মৈতৈদের অনেকে এই ধর্মের অনুসারী। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়াদের একাংশের মধ্যের ‘আপোকপা’ পুজার প্রচলন রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মণিপুরীরা বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়।

(৬)
‘রাধা, কৃষ্ণ, বিষ্ণু, গৌড়াঙ্গ এদের প্রধান দেব দেবী।’
মণিপুরীরা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী সেকারণে রাধা ও কৃষ্ণ এদের পরমারাধ্য। এছাড়া হিন্দুধর্মের পৌরাণিক দেব দেবীর মধ্যে বিষ্ণু, দুর্গা, শিব, স্বরসতী ও লীর পুজা মণিপুরীরা করে থাকে; গৌরাঙ্গ কোন দেব বা দেবী নন, তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রবক্তা মহাপুরুষ। এছাড়া মণিপুরীদের লৌকিক দেব দেবীর মধ্যে সরালেল, সনামাহি, পাখাঙবা, ইমাগিথানী ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য।

(৭)
‘মণিপুরীদের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা আছে। এই ভাষাকে বলা হয় মেথেয়ী।’
মণিপুরীদের মধ্যে দুইটি ভাষা প্রচলিত - মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরী মৈতৈ (‘মেথেয়ী’ নয়)। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার উপর গবেষনা ও সংরনকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ঝওখ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ বাংলাদেশের ৩৯টি ভাষার মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ ভাষাকে তালিকাভুক্ত করেছে এবং উভয় ভাষার জন্য ওঝঙ ৬৩৯-২ খধহমঁধমব পড়ফব বরাদ্দ করেছে। এছাড়া দুইটি ভাষাই ভারতে স্বীকৃত লাভ করেছে এবং ভারত সরকার মণিপুর, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের স্কুলগুলোতে মণিপুরী মৈতৈ ও মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া উভয় ভাষায় শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ করে দিয়েছে। উভয় ভাষারই প্রাচীন বর্ণমালা থাকলেও বর্তমানে মুদ্রন ও প্রকাশনার কাজে বাংলা অর ব্যবহৃত হয়।


অপরদিকে নবম ও দশম শ্রেণীর ‘
English for Today ’ পাঠ্যবইটির ১৭৮ ও ১৭৯ নং পৃষ্ঠায় মণিপুরীদের বিবাহ অনুষ্ঠান নিয়ে সম্পুর্ণ কল্পিত, ভিত্তিহীন ও মনগড়া তথ্য দেওয়া হয়েছে যা মণিপুরীদের সংস্কৃতি সম্বন্ধে শিক্ষার্থীদের মনে হাস্যকর ধারনা সৃষ্টি করবে। উল্লেখিত পাঠ্যবইয়ের একটি কমপোজিশনে মণিপুরীদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে -

The Monipuris want to … future by the sign and … marraige, they …. predict the future by interpreteing the … of the cock... is a Monipuri proverb: En Khang Tam Nau Bau, meaning all wisdom … cocks's foot...
যার সারমর্ম হলো মনিপুরীদের বিয়ের অনুষ্ঠানটি বড়ই অদ্ভূত... বিয়ের আগে মণিপুরী বরকনের উঠানে মুরগীর পা রশি দিয়ে বেঁধে বিভিন্ন ধরনের খেলা দেখানো হয়... এবং এভাবে বিবাহের শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়। সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো বইটিতে এই বিষয় নিয়ে রীতিমতো একটি প্রবচন রচনা করে তা মণিপুরীদের বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রথমত: মণিপুরীদের বিবাহের মধ্যে ‘মুরগীর পায়ে রশি বাঁধা’ জাতীয় ব্যাপার নেই। এ ধরনের ঘটনার কোন বিবরন বা অস্তিত্ত্ব মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া বা মণিপুরী মৈতৈদের প্রাচীন কোন লোকাচার, লোকসাহিত্য বা মিথলজিতেও পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয়ত: মণিপুরীদের মধ্যে হাঁস, মুরগী বা ছাগল পালনের প্রচলন নেই। গৃহপালিত জীবজন্তুর মধ্যে মণিপুরীরা প্রধানত গরু বা মহিষ পোষে থাকে কৃষিকাজের জন্যে।

তৃতীয়ত: একমাত্র মণিপুরী পাঙনদের মধ্যে হাঁস, মুরগী বা ছাগল পালনের প্রচলন রয়েছে কিন্ত তারা ইসলাম ধর্মাবালম্বী হওয়ায় তাদের বিবাহ মুসলিম শরীয়ত অনুযায়ী সম্পন্ন হয়ে থাকে, যেখানে মুরগী বা কোন জীবজন্তু নিয়ে এরকম হাস্যকর ক্রিয়ানুষ্ঠানের স্থান নেই।

চতুর্থত: মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া বা মণিপুরী মৈতৈ ভাষায় “এন খঙ তাম নাউ বাউ” নামে কোন প্রবাদ/প্রবচন নেই, এমনকি মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া বা মণিপুরী মৈতৈ ভাষায় শব্দকোষে ‘এন’, ‘খঙ’, ‘তাম’, ‘নাউ’ বা ‘বাউ’ বলে কোন শব্দ নেই।

তদুপরি উপরোক্ত পাঠ্যবইতে ‘মণিপুরী’ বানানটি ভুলভাবে ‘Monipuri’ লেখা হয়েছে যার অনুমোদিত ও প্রকৃত ইংরেজী বানান হবে ‘Manipuri ।